একজিমা (Eczema)
একজিমা (Eczema), যাকে
চিকিৎসা বিজ্ঞানে এটপিক ডার্মাটাইটিস (Atopic Dermatitis) বলা
হয়, ইহা একটি চর্মরোগ, যার ফলে ত্বকে
চুলকানি, লালভাব, ফুস্কুড়ি, ফাটল এবং শুষ্ক ভাব দেখা দেয়। ইহা একটি দীর্ঘমেয়াদি (ক্রনিক) এবং কখনো
কখনো বারবার ফিরে আসা রোগ, যা শিশু এবং প্রাপ্তবয়স্ক উভয়ের
মধ্যেই হতে পারে।
একজিমার কারণসমূহ:
একজিমা সাধারণত নিচের
কারণগুলোতে দেখা যেতে পারে: জেনেটিক প্রবণতা
(বংশগত)-যাদের
পরিবারে এজমা, এলার্জি বা একজিমা আছে, তাদের
মধ্যে এই রোগ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। ইমিউন সিস্টেমের অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া-
শরীরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সাধারণ উপাদানকে ক্ষতিকারক মনে করে প্রতিক্রিয়া দেখায়।
এলার্জেন বা উত্তেজক পদার্থ যেমনঃ ধুলাবালি, ঘাম ওাসায়নিক
সাবান, ডিটারজেন্ট, সুগন্ধি রং,
পশুর লোম ইত্যাদি।
মানসিক চাপ ও উদ্বেগ- অনেক সময়
অতিরিক্ত মানসিক চাপেও একজিমা বেড়ে যেতে পারে। আবহাওয়ার পরিবর্তন শীত বা অতিরিক্ত
গরমে, আর্দ্রতা কমে গেলে বা বেড়ে গেলে।
একজিমার লক্ষণসমূহ:
ত্বকে চুলকানি (প্রধান
লক্ষণ)। ত্বক লাল হয়ে যাওয়া। ছোট ছোট ফুস্কুড়ি। ত্বক ফেটে যাওয়া বা ছড়িয়ে পড়া।
শুষ্ক ও মোটা হয়ে যাওয়া। আক্রান্ত জায়গায় ব্যথা বা জ্বালা।
একজিমার ধরন:
এটপিক ডার্মাটাইটিস- বাচ্চাদের
মধ্যে বেশি দেখা যায়।
কন্টাক্ট ডার্মাটাইটিস- উত্তেজক
বা এলার্জেনের সংস্পর্শে এলে হয়।
ডিশিড্রোটিক একজিমা- হাতে-পায়ে
ফুস্কুড়ি।
নিউরোডার্মাটাইটিস- ঘন ঘন
চুলকানোর ফলে হয়।
সেবোরেহিক ডার্মাটাইটিস- মাথার
তালু বা মুখে তৈলাক্ত লালচে স্কেলি ভাব।
স্ট্যাসিস ডার্মাটাইটিস- পায়ের
রক্তপ্রবাহ কমে গেলে হয়।
সাবধানতা:
অতিরিক্ত সাবান বা গরম
পানি ব্যবহার করা যাবে না। চুলকানি হলে নখ দিয়ে চুলকাবেন না। উত্তেজক জিনিস থেকে
দূরে থাকতে হবে (ডিটারজেন্ট, পারফিউম, ইত্যাদি)। মানসিক চাপ
নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।
কারা বেশি ঝুঁকিতে?
শিশু ও কিশোরদের মাঝে ইহা বেশি
দেখা যায়। যাদের পরিবারে হাঁপানি, এলার্জি বা একজিমার ইতিহাস রয়েছে। অতিরিক্ত ডিটারজেন্ট,
সাবান বা সুগন্ধিযুক্ত প্রসাধনী ব্যবহারকারীরা।
ঘরোয়া যত্ন:
বেশি গরম পানি দিয়ে গোসল
এড়িয়ে চলতে হবে। ত্বক পরিষ্কার রাখতে হবে ও শুষ্ক না হতে দিন। তুলতুলে ও সুতি জামা
পরুন। চুলকানি করলে ঘষাঘষি না করে ঠান্ডা পানি ব্যবহার করতে হবে।
উপসংহার:
একজিমা মারাত্মক না হলেও
ইহা জীবনযাত্রায় বড় ধরনের অস্বস্তি তৈরি করতে পারে। ইহা দীর্ঘমেয়াদি হলেও সঠিক
পরিচর্যা ও চিকিৎসার মাধ্যমে সম্পূর্ণ আরোগ্য করা সম্ভব।
চিকিৎসা:
Graphites- ত্বক শুষ্ক,
মোটা ও খসখসে, চামড়া ফেটে গিয়ে তরল পদার্থ বের
হওয়া, কানে বা চোখের আশেপাশে একজিমা, স্থায়ী
ধরনের একজিমা, মোটা বা স্থলকায় ব্যক্তিদের জন্য কার্যকর।
Sulphur- তীব্র চুলকানি,
বিশেষ করে গরমে বা বিছানায় ঢোকার পর, স্কিন
লাল হয়ে যায় ও পোড়া-পোড়া অনুভূতি হয়, রোগী সাধারণত
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কম পছন্দ করে, পুরাতন বা বারবার ফিরে
আসা একজিমার ক্ষেত্রে কার্যকর।
Rhus Toxicodendron- Vesicular (ফুস্কুড়িযুক্ত)
একজিমা, চুলকানির সময় ঘষা বা চুলকালে আরাম লাগে, ঠান্ডা হাওয়া বা পানি লাগলে অবস্থা খারাপ হয়, গরমে
আরাম, একজিমা ফোঁড়ার মতো ফোলে যায়।
Mezereum- ত্বকে পুঁজযুক্ত
ফোস্কা বা ফাটল, ফোস্কার ভেতর থেকে ঘন সাদা রস বের হয়,
ত্বকে জ্বালাপোড়া অনুভূতি, মাথায় বা
স্ক্যাল্পে একজিমা হলে উপযুক্ত।
Petroleum- শীতে বা ঠান্ডা
আবহাওয়ায় একজিমা বাড়ে, চামড়া এতোটাই শুষ্ক হয় যে ফেটে রক্ত
বের হয়, গাঢ় বাদামি স্কিন প্যাচ, হাতে
বা পায়ে একজিমা বেশি হলে কার্যকর।
Calcarea Carbonica- স্থল, ঘাম প্রবণ ও সহজে ঠান্ডা লাগা রোগীদের জন্য, একজিমা
ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায়, শরীরে নানা ধরনের চর্মরোগের সঙ্গে
সম্পর্কযুক্ত।
Arsenicum Album- তীব্র জ্বালাপোড়া
ও চুলকানি, চুলকালে আরাম হয় না, বরং
জ্বালা বাড়ে রাতের বেলা উপসর্গ বাড়ে, বিশেষ করে ১টা থেকে
৩টার মধ্যে, রোগী সাধারণত শীতপ্রবণ ও অতিরিক্ত পরিষ্কার-
পরিচ্ছন্ন, শুষ্ক, পরতযুক্ত স্কিন র্যাশ।
Natrum Muriaticum- চামড়া শুদ্ধ ও
ফেটে যায়, একজিমা কেশবিন্দু (hair margins), গলায় বা হাতের পেছনে, অতীত মানসিক আঘাত বা দুঃখজনিত
কারণে চর্মরোগ, রোগী একাকীত্ব পছন্দ করে ও কষ্ট গোপন করে
রাখে।
Hepar Sulphuris - একজিমা সংক্রমিত
হয়ে পূজযুক্ত হয়ে গেলে (infected eczema), অতিশয় সংবেদনশীল
ত্বক, সামান্য ছোঁয়াতেই ব্যথা, ঠান্ডা
হাওয়া বা পানি লাগলে অবস্থা খারাপ হয়, ঘামে দুর্গন্ধ থাকে।
Psorinum- একজিমা বারবার
ফিরে আসে, ঋতু পরিবর্তনে বাড়ে, খুবই
খারাপ গন্ধযুক্ত চুলকানি ও নিঃসরণ, রোগী খুব ঠান্ডা অনুভব
করে, গরম জামা-কাপড় চায়, একজিমা শরীরের
কোনাকুনি স্থানে বেশি হয় (বাঁ পা/ডান হাত ইত্যাদি)।
Antimonium Crudum- ঘন ও পুরু চর্ম
স্তরযুক্ত একজিমা, খাবারের অনিয়ম বা হজমের সমস্যা থেকে
চর্মরোগ বেড়ে যায়, মুখের কোনায় ফাটল বা স্কিনে পুরু কালো অংশ,
গরমে খারাপ, ঠান্ডায় আরাম।
Dulcamara- একজিমা বর্ষাকাল
বা আর্দ্র আবহাওয়ায় বাড়ে, ঠান্ডা ও ভেজা জামা-কাপড় পরার পর
উপসর্গ বেড়ে যায়, চামড়ায় ফোলা ও চুলকানি।
Lycopodium- একজিমা মূলত
শরীরের ডান দিকে বেশি হয়, বিকেলের দিকে উপসর্গ বাড়ে, গ্যাস্ট্রিক ও লিভারজনিত রোগের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত, আত্মত্মবিশ্বাসে
ঘাটতি ও সহজে রেগে যাওয়া রোগীদের জন্য।
Croton Tiglium- ফোস্কাসহ একজিমা,
খুব দ্রুত চুলকানি ও নিঃসরণ শুরু হয়, নিঃসরণ
পাতলা ও জ্বালাপোড়াযুক্ত, একজিমা সাধারণত মুখে বা মুখের
চারপাশে দেখা যায়, চুলকানি এমনভাবে হয় যেন খোসা ছিঁড়ে ফেলতে
ইচ্ছা করে।
Kali Sulphuricum- চর্মে হলদেটে
নিঃসরণ (yellow discharge), ত্বকে ফ্ল্যাকি বা স্কেলি ধরনের
ফুস্কুড়ি, ঘামে অবস্থা খারাপ হয়, একজিমা
যদি পালসেটিলার মতো লক্ষণ নিয়ে হয়, তবে ইহা পরবর্তী ওষুধ
হিসেবে কাজ করে।
Tarentula Cubensis- সংক্রমণজনিত
একজিমা বা তীব্র প্রদাহ, ত্বক কালচে বা বেগুনি হয়ে যেতে পারে,
অত্যন্ত পুঁজযুক্ত ও ব্যথাযুক্ত ঘা, ক্যান্সার
জাতীয় বা বিষাক্ত ইনফেকশনযুক্ত স্কিন কেসে ব্যবহৃত হয়।
Thuja Occidentalis- একজিমা বা ত্বকের
সমস্যা যদি টিকা নেয়ার পর শুরু হয়, ত্বকে ফোলা, খসখসে ভাব ও গাঢ় বাদামি দাগ, তৈলাক্ত ত্বকে ফুস্কুড়ি,
চর্মরোগের সঙ্গে মাথাব্যথা বা ইউরিনারি সমস্যা থাকলে উপকারী।
Urtica Urens- দগদগে চুলকানি,
জ্বালাপোড়া, লাল দানা, হাইভস
বা এলার্জি জাতীয় একজিমা, গরম জলে আরাম লাগে, মধুমেহ বা ইউরিক এসিড সমস্যায়ও কার্যকর।
Alumina- চামড়া শুষ্ক,
শক্ত ও মোটা হয়ে যায়, একজিমা শুষ্ক, দানা হয়ে থাকে, রোগী চিরুনির মতো খুঁটে খুঁটে খোসা
তুলতে চায়, কোষ্ঠকাঠিন্য থাকলে ভালো ফল দেয়।
Carbo Veg- ত্বক ফ্যাকাশে
রক্ত সঞ্চালন দুর্বল, পুরাতন ও নিঃসরণবিহীন একজিমা, চুলকানির পর ত্বক থেকে গাঢ় দাগ পড়ে যায়, বয়সজনিত
দুর্বলতা থাকলে কার্যকর।
Tellurium- একজিমা রিংওয়ার্ম
জাতীয় (গোল গোল আকারে), তীব্র দুর্গন্ধযুক্ত নিঃসরণ, একজিমা এক অংশ থেকে অন্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে, চামড়ার
নিচে দগদগে অনুভূতি।।
Sanicula Aqua- খুব বেশি ঘাম হওয়া
কিন্তু ত্বক শুষ্ক ও খসখসে, একজিমা শীতে বাড়ে, চামড়া ফেটে গিয়ে রক্ত বের হয় ও চুলকানিও তীব্র।
Ranunculus Bulbosus- একজিমা
ফুস্কুড়িযুক্ত এবং বার্নিং (burning) ও জ্বালা যুক্ত,
স্ক্যাল্প, চামড়ার নিচে ফোঁড়ার মতো ফুস্কুড়ি
হয়, আবহাওয়ার পরিবর্তনে রোগ বাড়ে।
Visla Tricolor- বাচ্চাদের মাথায় ও
মুখে ঘন নিঃসরণযুক্ত একজিমা, চুলকানির সময় ঘাম হয়, ঘুমের সময় উপসর্গ বেশি হয়, ঘন হলুদ নিঃসরণ।
Oleander- চুলকানোর পর ত্বক
খুব বেশি সেনসিটিভ হয়ে পড়ে, একজিমা স্ক্যাল্পে হলে এবং
খুশকির মতো হলে, খুব অল্পতেই ত্বকে ছোপ পড়ে।
Bovista- মেকআপ বা
কসমেটিকস ব্যবহারের কারণে একজিমা, ফুস্কুড়ি চুলকায়, গরমে বাড়ে, ত্বকে ফোলা ও পানির মতো নিঃসরণ হয়।
Mercurius Solubilis- একজিমা পুঁজযুক্ত,
জ্বালাপোড়া সহ চুলকাতে গিয়ে ঘা তৈরি হয়ে যায় রাতে বা বিছানায় ঢোকার
পর উপসর্গ বেড়ে যায়, মুখে লালা বেড়ে যাওয়া বা মুখে দুর্গন্ধ
থাকলে কার্যকর।
Clematis Erecta- যৌনাঙ্গের আশেপাশে
একজিমা বা ফুস্কুড়ি, নিঃসরণ পাতলা, জ্বালাপোড়াযুক্ত,
গরমে উপসর্গ বাড়ে, ঠান্ডায় আরাম।
Anagallis Arvensis- তীব্র চুলকানি ও
জ্বালা, একজিমা হাতে, আঙ্গুলের ফাঁকে
বা কব্জিতে বেশি, স্কিনে ফাটল বা প্যাচ হয়।
Skookum Chuck- কান, নাক বা স্ক্যাল্পে ফোঁড়া ধরনের একজিমা, গাঢ় নিঃসরণ
বারবার ঘা শুকিয়ে আবার হয়।
Sarsaparilla- হাত বা পায়ে ফাটা
একজিমা, গরমে অবস্থা খারাপ, শীতল
বাতাসে কিছুটা আরাম, প্রস্রাবজনিত সমস্যা থাকলে একসঙ্গে ভালো
কাজ করে।
Fagopyrum Esculentum- একজিমা চুলকাতে
চুলকাতে রক্ত বের হয়ে যায়, গরমে অসহ্য হয়, ঠান্ডায়
কিছুটা উপশম, ত্বক খুব
স্পর্শকাতর হয়ে পড়ে।
Hydrocotyle Asiatica- ঘন ও মোটা চামড়ায়
একজিমা, স্কেলি, প্যাঁচযুক্ত ফুস্কুড়ি,
চুলকানি তুলনামূলক কম কিন্তু স্কিন মোটা হয়ে যায়।
Borax- মুখে, ঠোঁটের কোণে বা নাকের পাশে একজিমা, শিশুদের মুখে ঘা
বা ফুস্কুড়ি হলে ভালো কাজ করে।
Cistus Canadensis- ঠান্ডা সংবেদনশীল
একজিমা, শীতল বাতাসে বাড়ে, ঘাড়,
গলা বা ঘাড়ের নিচে বেশি
হয়, তীব্র চুলকানি ও জ্বালাপোড়া।
Formica Rufa- তীব্র চুলকানিসহ
চর্মরোগ, রিউমাটিক ব্যথা বা হাড়ের ব্যথার সঙ্গে চর্মরোগ
থাকলে কার্যকর, গরমে বা ঘামে বাড়ে।
Vinca Minor- মাথার চুল পড়ে
যাওয়ার সঙ্গে একজিমা, চুলকাতে চুলকাতে রক্ত বের হয়, একজিমা মাথায় হলে এবং সঙ্গে খুশকি থাকলে ভালো কাজ করে।
